অনলাইন ডেস্ক: আজ শাপলা চত্বর গণহত্যা দিবস। ২০১৩ সালের এই দিনে (৫ মে) মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে রাতের অন্ধকারে চালানো নারকীয় অভিযানের স্মৃতি আজও বাংলাদেশের মানুষের মনে দগদগে ক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে।
ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের শাস্তি ও ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা অবরোধ করতে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তির সেই নৃশংস প্রয়োগকে অনেকেই ‘শাপলা গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেন।


দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সেন্সরশিপ ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে এই ঘটনার প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও ভয়াবহতা জনসমক্ষে আসতে পারেনি। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ট্র্যাজেডি নিয়ে নতুন করে সত্য প্রকাশের পথ উন্মোচিত হয়েছে।

‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামক সেই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে ঠিক কতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। তৎকালীন সরকার নিহতের সংখ্যা নগণ্য দাবি করলেও, মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ৬১ জন নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল। তবে এই ঘটনার বিচার ও প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনে সবশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেই রাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে চালানো অভিযানে সাউন্ড গ্রেনেড ও মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে এই প্রাণহানি ঘটে, যার তথ্য-প্রমাণ ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এখন নথিবদ্ধ করা হচ্ছে।
গণহত্যার এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ডিএমপির পলাতক কমিশনার বেনজীর আহমেদ, গুমে কুখ্যাতি পাওয়া সাবেক র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত এ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অনেক পরিবার যারা গত এক দশকের বেশি সময় ভয়ে মুখ খোলেনি, তারা এখন তাদের নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে কিংবা হত্যার বিচারের দাবিতে সরব হচ্ছেন।
শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান।
গত রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের লাখো মানুষের জমায়েতের ওপর তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পরিকল্পিত ও নৃশংস হামলা চালিয়েছিল। সেই গণহত্যায় অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং হাজার হাজার আলেম, হাফেজ ও জনতা আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
বিবৃতিতে ৫ মের মহান শহীদদের স্মরণে সারা দেশে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করতে সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
হেফাজত নেতারা বলেন, ৫ মের গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে করা মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাপলার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানান।
২০১৩ সালের ৫ মের গণহত্যার প্রতিবাদে সবাই মাঠে নামলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বড় হত্যাকাণ্ড (ম্যাসাকার) দেখতে হতো না বলে বিবৃতিতে আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়। নেতারা বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলারদের উসকানি ও সুশীল সমাজের বড় অংশের নীরবতার মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে পেরেছিল বলে তাঁরা মনে করেন।
হেফাজত নেতারা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, শাপলার রক্তাক্ত চেতনাকে জাগ্রত রাখতে হবে। বর্তমান সরকার যদি প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে—এটি সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available