মো. হানিফ মেহমুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র কাড়াকাড়ি। দলের একাধিক প্রার্থী ও সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা জোরদার হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তেজনা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এ নির্বাচনকে ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটবাজার– সবখানেই চলছে ভোটের আলোচনা, প্রার্থী ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ।


যদিও এবারের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভূমিকা অনেকটাই ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকলেও দলটির সমর্থকদের ভোট কার ঝুলিতে যাবে তা নিয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যেই চলছে জোর প্রচেষ্টা। ভোট টানতে দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি, ধর্মপ্রাণ ভোটারদের জন্যও থাকছে আলাদা বার্তা।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করলে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশীদ।
১০ জানুয়ারি রাতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ এখন ভোট করছে না, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতীক নেই। এখন তারা কাকে ভোট দেবে এটা তাদের পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু আমাকে ভোট দেবে এমন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করলে আমি জনসাধারণকে নিয়ে থানা ঘেরাও করব।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লতিফুর রহমান সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে যোগ দিলে তারা সব দায়দায়িত্ব নেবেন।
তিনি বলেন, “আগামী দিনের বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন হতে চলেছে। আমাদের দলে আপনারা আওয়ামী লীগ থেকে আসবেন। আপনাদের সব দায়দায়িত্ব আমরা নেব। জেলখানা, নবাবগঞ্জ থানা, যে কোনো দায়দায়িত্ব আমরা নেব।”
স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, এ দুই আসনে জামায়াত-বিএনপি প্রায় সমানে সমান অবস্থানে। যে পক্ষ আওয়ামী লীগের ভোট টানতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জয় তার দিকেই যেতে পারে। তবে নানা কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (ভোলাহাট, নাচোল ও গোমস্তাপুর) আসনে জামায়াতকে তুলনামূলক এগিয়ে রাখছেন অনেকে।
এ জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের ঘিরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সুন্দরপুর ইউনিয়নের জয়ন্দীপুর মোন্নাপাড়া গ্রামের ইসরাফিল আলমের দাবি, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল এবার বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।
তার বক্তব্য শেষ না হতেই শফিকুল ইসলাম নামের এক তরুণ বলেন, “কোনো সুযোগ নেই বিএনপির হারুনুর রশীদই এবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। এভাবে দুই পক্ষই নিজেদের প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন।”
নির্বাচন নিয়ে জনমত, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জানতে তৃণমূল থেকে শহরতলি ঘুরে সাধারণ ভোটার, রাজনীতিক, বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনেই এবার জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট।
বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে কোনো পক্ষকেই এখনও স্পষ্টভাবে এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন মাসুদ বলেন, “নির্বাচনি পরিবেশ ভালো রয়েছে। যৌথ বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আচরণবিধি মানতে ১১ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টিম কাজ করছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। জেলার ৫১৫টি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে, থাকবে বডি ক্যামেরাসহ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি আসলাম কবির বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত ও বিএনপি দুই দলই শক্তিশালী। এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকলেও দলটির প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থক ভোট দিতে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ভোটার এককভাবে কোনো প্রার্থীকে নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। তাই সামগ্রিকভাবে তিনটি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসন এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও মোটামুটি ভালো। তবে প্রার্থীদের কিছু বক্তব্যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, যা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জজকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম রেজা বলেন, “গত ১৬ বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তেমন উৎসাহ ছিল না। কারণ, অনেকেই মনে করতেন ফলাফল আগেই নির্ধারিত। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করছে, নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সে কারণেই ভোট নিয়ে আগের মতো উৎসাহ ফিরে এসেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য ইতিবাচক। তার মতে, কোনো একক দল বা প্রার্থীকে খুব বেশি এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না, তবে ফলাফলে আওয়ামী লীগের ভোট গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।”
এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ফজলুর ইসলাম খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে মনিরুল ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে শফিকুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available